আন্দোলনে আর কে কে আছে নাম বল; না হলে তোকে মেরে ফেলা হবে...!
“আন্দোলনে আর কে কে আছে নাম বল; না হলে তোকে মেরে ফেলা হবে, আর না হয় পুলিশে দিয়ে গুম করে ফেলবো...!”
ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছেড়ে বুটেক্সে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা আমার জন্য বেশ কঠিনই ছিলো। তার উপর প্রথম বছর পুরোটাই থাকতে হয়েছিলো বাইরের মেসে। সেকেন্ড ইয়ারে এসে ওসমানী হলে সিট পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। তবে সেদিনের সেই স্বস্তিই যে এক পর্যায়ে এসে আফসোসে পরিণত হবে, তখনও জানতাম না।
ছোটবেলা থেকেই ডিসিপ্লিন জিনিসটা খুব পছন্দ করি। চার ভাই এর বড় পরিবারে মানুষ হয়েছি। বাবা থাকতেন দেশের বাইরে। বখে যাওয়ার সব রকম সুযোগই তাই সামনে ছিলো। বাট ঐ যে বললাম, ডিপিপ্লিন পছন্দ করতাম খুব। তাই ক্লাস ফাইভ, এইট বা মেট্রিকে বৃত্তি পেতে খুব কষ্ট হয় নাই। তাই বলে আমাকে শুধু বইতে মুখ গুজে থাকা আঁতেল ভাবার দরকার নাই। লেখাপড়ার পাশাপাশি কো কারিকুলার এক্টিভিটিতেও ছিলো আমার সমান আগ্রহ।
অবশ্য এই আগ্রহই খুব সম্ভবত আমার জন্য কাল দাড়িয়েছিলো ইউনিভার্সিটিতে এসে।
ডিসিপ্লিন পছন্দ করা আমি ইউনিভার্সিটিতে এসে আবিষ্কার করলাম, এখানে কোন ডিসিপ্লিন নাই। অথোরিটি নাই। হলে কে উঠবে, হলে কে সিট পাবে, কত টাকা দিতে হবে, কোনকিছুই এখানে কতৃপক্ষ ঠিক করে না। বরং ঠিক করে ছাত্রলীগ।
গণরুমের অবস্থা খুবই খারাপ। থার্ড ইয়ারে এসে একটা রুম পাই। ৪ জনের রুমে থাকতে হয় ৮-১০ জন। তবে উপায়ও নাই। পড়াশোনার সুবিধার জন্য আর নেটওয়ার্কিং এর জন্য এই বন্দোবস্ত মেনে না নিয়ে আর উপায় কী? ভালো মন্দ মিলিয়ে তাই খুব একটা খারাপ যাচ্ছিলো না। বরং মানিয়েই নিয়েছিলাম অনেকটাই। ঠিক তখনই আমার জীবনে নেমে আসে ঝড়। অবশ্য, ঝড় তখন সারা দেশেই চলছিলো।
ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ২০১৮ সাল। সারা বাংলাদেশ অবাক হয়ে দেখলো, একদিন সকালে দেশের সমস্ত ছেলে মেয়ে নেমে আসলো রাস্তায়। দাবি? নিরাপদ সড়ক চাই। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। ঢাকায় শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো সারি দেশে। ছোট ভাইয়েরা যখন রাস্তায় নামে, বড় ভাইদের পক্ষে কি আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব?
একে একে সকল ইউনিভার্সিটি এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে রাস্তায় নামতে থাকে। আমি সেই আন্দোলনে সামনে চলে আসি। থার্ড ইয়ারে পড়ি। সো, সেকেন্ড ইয়ার ফার্স্ট ইয়ার মোবিলাইজ করে আন্দোলনে নামানোর দায়িত্বটা আমার উপরেই ছিলো। প্রতি রাতেই মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিতাম মিছিলের কথা। এই মেসেজগুলোর স্ক্রিনশট ওদের হাতে যেতে থাকে। তবে এই স্ক্রিনশটগুলো সমস্যা ছিলো না, এই স্ক্রিনশটগুলো বরং ছিলো সমস্যার শুরু।
২০১৮ সালের ০৫ আগস্ট। দুইটা ঘটনা ঘটে।
১। আমার রুমমেট সরকারকে সমালোচনা করে একটা পোস্ট দেয়।
২। পরদিন রোজা রাখবো বলে আমি আগে আগেই ঘুমাইয়া যাই।
ঐ রাতে রাত তিনটার দিকে কিছু ছেলেপেলে এসে রুমে ধাক্কা দিতে শুরু করে। সাধারণ কোন নক না, বরং জোরে ধাক্কাধাক্কি। মনে হচ্ছিলো দরজা ভেঙে ফেলবে। দরজা খুলে দেখি ছাত্রলীগের হল সেক্রেটারিসহ আরো কয়েকজন। আনুমানিক ৬-৭ জন আসলেও এই মুহূর্তে নাম মনে আছে ৩ জনের। নন্দী, ফাহাদ আর সাজ্জাদ।
যদিও রুম থেকে সবাইকেই ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়, বাট আমি খুব ভালো করেই জানতাম, টার্গেট আমরা দুইজনই এবং আসলেও তাই হয়। গেস্টরুমে এনে আমাদের দুজনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। যে ছেলেটা পোস্ট দিয়েছিলো, তাকে ক্রমাগত থাপ্পড় মারা হচ্ছিলো। আর এই সময় আমার ফোন আর ল্যাপটপে চলছিলো কড়া চেকিং।
মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে আমার কোন চিন্তা ছিলো না। চিন্তা ছিলো একটা রিপোর্ট বই নিয়ে। শিবিরের রিপোর্ট বই। এবং সেই রিপোর্ট বইটা ওরা পেয়ে যায়। সাথে সাথে সবাইকে বের করে দেওয়া হয়। শিবির পাওয়া তখন বিরাট ক্রেডিট এর ব্যাপার। এখন আমাকে নিয়েই উৎসব করা হবে। আর কারো দরকার হবে না।
শুরুটা করে নন্দী। আমার বাম কানে এতো জোরে চড় মারে যে পরের তিন মাস জেলে থাকার সময় আমি ঠিকমত কিছুই শুনতাম না। ডাক্তার কান দেখে বলেছিলো, অল্পের জন্য কানের পর্দা ফাঁটে নাই। এরপর সেই মিছিলের মেসেজ। মেসেজটা ছিলো মূলত নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মিছিল কথারও জন্য। কিন্তু ওরা এইটাকে শিবিরের মিছিল বানিয়ে আমার উপর চড়াও হলো। একসাথে ৬ জনই আমাকে কিলঘুষি মারতে শুরু করে। শিবির পাওয়ার আনন্দে বিভোর সবাই।
ভোর ৫ টা পর্যন্ত গেস্টরুমে এই উৎসব চলে। কিছুক্ষণের জন্য থামা দেখে মনে হয়েছিলো, শেষ হলো বুঝি। বাট ঐটা ছিলো সাময়িক বিরতি। এরপর আমাকে নেওয়া হয় চারতলার ছাত্রলীগের রুমে। এরপর শুরু হয় ইন্টারোগেশন। শিবির কেন করি? তাবলীগ কেন করি না?
শিবিরের সাথে সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করার পরে আরেক দফা মার শুরু হয়। এবার কিল ঘুষি না, বরং এবারের অস্ত্র ছিলো স্ট্যাম্প। হাটুর উপরের থাই লক্ষ্য করে নির্যাতন চলতে থাকে। এবারের মারপিটে লিড দেয় ফাহাদ আর নন্দী। বিরতিহীন নির্যাতনে আমার পা ক্লান্ত হয়ে যায়, ওরা ক্লান্ত হয় না।
মনে পড়ে মায়ের কথা। ছোটবেলায় শুনতাম, লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে । লেখাপড়া করে ভালো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যদি জানতাম এভাবে মার খেতে হয়, তাহলে আমি লেখাপড়া করতাম না কোনদিন।
আমি চিৎকার করে উঠি, মা, মা....
আমার কথার কেউ উত্তর দেয় না।
শেষপর্যন্ত আমি কথা দিই যে আমি কোন জুনিয়রকেই কখনো শিবির করতে ডাকবো না। লাভ হয় নাই, মার থামেনি। আমার ফোন থেকে আরো দুইজনকে খুজে পায় ওরা। ওদেরকেও পরবর্তীতে নির্যাতন করা হয়। তবে মারের চেয়েও নোংরা একটা কাজ ওরা আমার সাথে করেছিলো সেদিন।
আমার ল্যাপটপে আজেবাজে ছবি পাওয়া গেছে বলে, ক্যাম্পাসে আমার চরিত্র হননের চেষ্টা। তবে সবচে সুন্দর ব্যাপার হলো, ওদের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। আমাকে সবাই চিনতো, বিশ্বাসটাও তাই আমার উপরেই রেখেছিলো। শিবিরের আলাপ পাল্টে এবার ওরা আমাকে জঙ্গি বলে সম্বোধন করা শুরু করে। যতই অস্বীকার করি, তারা আমাকে তত বেশি জঙ্গি প্রমাণে উঠে পড়ে লাগে।
বেশ কিছুদিন আগে তুরস্কে পিএইচডি করতে থাকা আমার এক শিক্ষকের উদ্যোগে ফিলিস্তিনের জন্য কিছু টাকা উঠাই। এবং সেই টাকা ফিলিস্তিনে পাঠানোর চেষ্টা করি। এটাকেই তারা জঙ্গিবাদ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করতে থাকে।
সারা রাতের অত্যাচার শেষে আমাকে ঐ ছাত্রলীগের রুম থেকে বের করা হয় সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার দিকে। এ সময় আমার মুখ গামছাতে ঢেকে রাখা হয়। যাতে কেউ আমাকে চিনতে না পারে। এরপর আমাকে ঐ অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তেজগাও থানায় যাওয়ার পর দেখি বহু ছেলেকে তুলে এনেছে। সবার একই অপরাধ, নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করা।
একেকজন একেক ইউনিভার্সিটির। কেউ কাউকে চিনিও না। অথচ কেসে লেখা হলো আমরা বিস্ফোরণের ঘটনার সাথে জড়িত। এই কেসে আমাকে প্রায় ৯০ দিন জেলে থাকতে হয়েছিলো। জামিন মিলেছে, কিন্তু মুক্তি তো মেলেনি। আজও আমি সেই মিথ্যা মামলার ঘানি মাথায় নিয়ে বেড়াচ্ছি, কবে মুক্তি পাবো, আমি জানি না।
এই ঘটনার পর আমি সব দিক থেকেই একা হয়ে যাই। বন্ধুদের অবশ্য দোষ দিই না। আমার সাথে মিশে থার্ড ইয়ারে কেস খাওয়ার সাহস কে করবে? স্যাররা ভেতরে সহযোগিতা করলেও উপরে উপরে আমাকে এড়িয়ে চলেছে।
কষ্ট একটাই। এই ঘটনার পর আমার মা ভেঙে পড়ে। আমার আর কখনোই হলে থাকা হয় নাই। এমনকি ইউনিভার্সিটির পরিচয়, মানে আইডি কার্ড পর্যন্ত ওরা আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিলো। আমার বড় ভাই আইডি কার্ড নিতে আসলে আইডি কার্ড দেওয়া তো দূরের কথা, ফাহাদ আর নন্দী আমার বড় ভাইকে অপমান পর্যন্ত করে।
বিনা দোষে নিজের অপমান মেনে নেওয়া যায়, মেনে আমি নিয়েছিও। কিন্তু যেই সন্ত্রাসীদের কাছে আমার পরিবারকে পর্যন্ত অনিরাপদ হতে হয়েছে, সেই সন্ত্রাসীদের বিচার এই রাষ্ট্রকে অবশ্যই করতে হবে।
মোঃ নুরুদ্দীন
৪১তম ব্যাচ, বুটেক্স
ফুটনোট: নুরুদ্দীনের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নুরুদ্দীনের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।
সম্ভাব্য শাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।