সবাই দেখেছিল, কিন্তু সেদিন কেউ এগিয়ে আসেনি

৪ অক্টোবর, ২০২৬

"দেখো বাবা, জলে থেকে কুমিরের সাথে লড়াই করা যায় না। তুমি বরং ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করো।"

কথাটা বলেছিলেন আমাদের হলের BSW। বলতে বলতে তাঁর চোখে পানিও এসেছিল।

আমার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ে। বুঝে যাই, এই ক্যাম্পাসে আমার জন্য কোনো আশ্রয় নেই।

অথচ ঠিক কয়েক দিন আগে আমিই একজনকে আশ্রয় দিয়েছিলাম।

শুরুটা বলি।

আমার জন্ম টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের বামনহাটা গ্রামে। একদম অজপাড়াগাঁ। বাবা ঢাকার একটা স্কুলে গণিত পড়াতেন। আমি দাখিল পাস করেছি মাদ্রাসা থেকে, এইচএসসি সরকারি কলেজ থেকে।

স্বপ্ন ছিল ফিজিক্সে পড়ে বিজ্ঞানী হবো। কিন্তু বাড়ির সবাই চাইতো মেডিকেল। মাঝখান থেকে বুয়েটের এক ভাই বললেন, বুয়েটের প্রস্তুতি নিলে বাকি সব এমনিতেই হয়ে যায়।

কথাটা মনে ধরলো।

কোচিং করতে ঢাকায় এসে টাইফয়েড, জন্ডিস, সবই একে একে ধরলো। দুই মাস বিছানায়। ক্লাস ফোর থেকে একটা রোজাও ভাঙিনি, সেবার ভাঙতে হলো পনেরোটা।

বাবা বললেন, এত কষ্টের দরকার নেই, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দেবো।

আমি শেষবার চেষ্টা করলাম। শিটগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরে নিজে পড়লাম। পরীক্ষার ২০-২৫ দিন আগে আবার ঢাকায় এলাম। বাবা-মায়ের অমতে জাহাঙ্গীরনগরে পরীক্ষা দিয়ে হলাম ৭৭তম। সেদিন মনোবলটা ফিরে পেলাম। এরপর রাজশাহী, রুয়েট, কুয়েট, সবখানে চান্স।

বুয়েটেও হলো। ২০১১ সালে, আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং-এ।

আমার গ্রামে তখনো কেউ বুয়েটে চান্স পায়নি। সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন বাবা। কারণে-অকারণে সবাইকে বলে বেড়াতেন, "আমার ছোট ছেলে বুয়েটে চান্স পেয়েছে।"

তাঁর সেই বাড়িয়ে বলা শুনেই বুঝতাম, তিনি কতটা খুশি।

ক্লাস শুরু হলো ভিসিবিরোধী আন্দোলনের কারণে পরের বছর মে মাসে। ফর্মে ঢাকার ঠিকানা দেওয়ায় হলে সিট হলো না। তার ওপর তখন পাঁচটা ব্যাচ একসাথে চলছিল, আবাসন সংকট। আজিমপুরের মেসে উঠলাম। আমার পেটের সমস্যা, ঠিকমতো খেতে পারতাম না, প্রায়ই অসুস্থ হয়ে বাড়ি যেতাম। দেড় বছর এভাবেই গেল। প্রথম দুই সেমিস্টারের রেজাল্ট তাই ভালো হয়নি। ঢাকায় থিতু হওয়ার পর রেজাল্টও ঠিক হতে শুরু করলো।

শেরেবাংলা হলে উঠলাম। সেবা নামের ব্লাড ডোনেশন ক্লাবের ভলান্টিয়ার ছিলাম বলে একবার হল ছাড়তে হয়েছিল। তিন-চার মাস পর ফিরি। এবার নিজের সিটে উঠতে পারি না, কারণ সেখানে থাকেন আমারই ডিপার্টমেন্টের এক ছাত্রলীগ নেতা সিনিয়র। প্রভোস্ট স্যার একদিন ফোন করে সিট বাতিলের কথা বললে তবেই সব খুলে বলি। স্যার আমাকে ৩০৮ নম্বর রুমে তুলে দেন।

এবার সত্যিই ভালো চলছিল।

তারপর এলো সেই ছেলেটা।

হলে ভর্তির ইন্টারভিউ চলছিল। আমি নিচে ঝর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলাম। রুমমেটদের বিরক্ত করতে চাই না বলে ফোন ধরতে সবসময় নিচেই নামতাম।

টাঙ্গাইলের কিছু জুনিয়র এসে আমার সাথে দেখা করলো। তাদের সাথে এক ছেলে। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। হলে সিট পায়নি, বাবা ভ্যান চালান, বাইরে থাকার সামর্থ্য নেই।

সিনিয়ররা র‍্যাগ দেয়, এটাই নিয়ম ছিল। আমি কখনো কাউকে র‍্যাগ দিইনি। তাই ওরা ভরসা করে আমার কাছেই এসেছিল।

আমি ওকে প্রভোস্ট স্যারের কাছে পাঠালাম। স্যার প্রায়োরিটি লিস্টে রাখলেন, কিন্তু সিট হলো না। ছেলেটা আবার ফিরে এলো আমার কাছে।

ওর পরিচয়, রাজনীতি, ব্যাকগ্রাউন্ড, কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, সে বুয়েটের ছাত্র, বিপদে পড়েছে, আর আমি সিনিয়র।

সেদিন রাতে নিজের রুমেই জায়গা দিলাম।

ওর কাছ থেকে শুনলাম পড়াশোনার গল্প, দরিদ্র পরিবার থেকে বুয়েটে আসার সংগ্রাম। কিছুদিন পর সে জিমনেসিয়ামের গণরুমে চলে গেল।

এর বেশি আর কিছু না।

আর এইটুকুর জন্যই আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাতটা নেমে এলো।

আমি জেনেছি অনেক পরে। তিতুমীর হলের ১৫ ব্যাচের এক ছেলে ফেসবুকে ধর্মীয় পোস্ট দিতো। ছাত্রলীগ তাকে ধরে বললো, "তুই শিবির। বল আর কে কে আছে!" সে শিবির করতো না, বলবে কী? তখন জিজ্ঞেস করা হলো, রাজশাহীতে কাদের সাথে থাকতো। মারের চোটে সে কয়েকটা নাম বললো। তার একটা নাম আমার আশ্রয় দেওয়া ছেলেটার।

ওরা গণরুমে খুঁজতে গেলে বলা হলো, "ও তো তিন তলার এক সিনিয়রের সাথে থাকে।"

লতায়-পাতায় জড়াতে জড়াতে ঘটনা এসে ঠেকলো আমার দরজায়।

২ মে, ২০১৬। রাত এগারোটা।

আমি বন্ধুর সাথে গ্রুপ প্রজেক্টের ডিজাইন নিয়ে বসেছি। দরজায় আমার হলের ১২ ব্যাচের জুনিয়র শাফায়েত চৌধুরী জয় আর ইমতিয়াজ।

"ভাই, একটু বাইরে আসেন।"

আমি হেসে বললাম, "জয়, কী খবর? ভেতরে এসো।"

তখনো বুঝিনি।

এরপর ঢুকলো বুয়েট ছাত্রলীগের সেক্রেটারি আবু সাঈদ কনক, মেকানিক্যাল ১০ ব্যাচ। অন্য হলের ছেলে। আমার সাথে তার কোনো দরকার থাকার কথা না।

তখনই বুঝলাম, কিছু একটা ঠিক নেই।

কোনো কথা ছাড়াই চড়। তারপর প্রশ্ন, "ছেলেটা তোর রুমে কী করতো? তোর সাথে কী সম্পর্ক?"

ছেলেটাকে আমার সামনেই মারা হলো। সে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "ভাই শুধু কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিয়েছিলেন।"

ওরা আমার বই, বিছানা, লকার, ল্যাপটপের ফোল্ডার, সব উল্টে ফেললো। কিছু পেলো না। শুধু ফোনে একটা এসএমএস পেলো। বুয়েটের এক ভাইয়ের আয়োজন করা অর্থসহ কুরআন প্রতিযোগিতার একশো টাকার রেজিস্ট্রেশন ফি।

ওদের কাছে এটাই ছিল "বড় আবিষ্কার"।

"শিবিরের ইভেন্ট। তুইও শিবির।"

আমি বললাম, এটা অরাজনৈতিক, প্রতিযোগিতা অনেক আগেই শেষ। শুনলো না। বললো, "ওকে ওষুধ দেওয়া হয়নি, তাই সত্যি বলছে না। এবার ওষুধ দাও।"

ওদের ভাষায় ওষুধ মানে মার।

বারান্দায় নিয়ে শুরু হলো স্ট্যাম্পের ব্যবহার। হাঁটুতে কয়েকটা বাড়ি খেয়ে আমি পড়ে গেলাম, আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। জয় আর ইমতিয়াজ আমাকে উঁচু করে ধরে রাখলো, কনক স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাতে থাকলো।

আমি চিৎকার করছিলাম। শুধু ব্যথায় না। আমার প্রভোস্ট স্যার থাকতেন আমারই ব্লকের নিচে। তাঁর কড়া শাসনে আমাদের হলে র‍্যাগিং বন্ধ ছিল। খবর পেলে দশ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতেন।

আমি চেয়েছিলাম, তিনি শুনুন।

তিনি আসেননি।

পরে জেনেছি, আসার পথে তিনি BSW-কে ফোন করেছিলেন। BSW নাকি বলেছিলেন, "এটা রাজনৈতিক ব্যাপার, আপনি জড়াবেন না। ওরা নিজেরাই মিটমাট করে নেবে।"

আমার বাবা বারবার প্রভোস্টকে ফোন দিলেন। প্রভোস্ট আর ফোন ধরলেন না।

সেই রাতে আমার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। আমার ছাত্রলীগ করা বন্ধুও না। একজনকে অনুরোধ করা হয়েছিল, সে বলেছিল, "দোস্ত, আমি পারবো না। আমার সমস্যা হবে।"

সাধারণ ছাত্ররা ভয়ে সামনে আসেনি। ভয় পাওয়ার কারণও ছিল। দু-তিন মাস আগে আরেকটা ছেলেকে সারারাত পিটিয়ে, প্রভোস্টকে দিয়েই বহিষ্কার করানো হয়েছিল।

ওদের রাজত্বে কেউ মুখ খুলতো না।

বারান্দার পর নিচতলার গেস্টরুমে। সেখানে আশ্রয় দেওয়া ছেলেটা আর ১৩ ব্যাচের আরেকজনকে আনা হলো। ওদের সামনেই আমাকে বলা হলো, "তুই তো এদের লিডার। তোর জন্য আলাদা ট্রিটমেন্ট।"

আমাকে জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে দাঁড়াতে বলা হলো। পেছন থেকে পায়ে, পিঠে মার। ব্যথায় কুঁকড়ে গ্রিল ছেড়ে দিলেই ১৩ ব্যাচের মেহেদি হাসান রাসেল সাথে সাথে আমার হাত আবার গ্রিলের সাথে ঠেসে ধরছিল। শক্ত করে না ধরলে হাতেই মারছিল।

এই রাসেল সেই রাসেল, যে আবরার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি।

আমি পড়ে যাচ্ছিলাম, আর বারবার তুলে ধরে আবার মারা হচ্ছিল।

তারপর ঘাড় ধরে আমাকে নেওয়া হলো ফার্স্ট ইয়ারের গণরুমের দিকে, হলের দুই ব্লকের মাঝের ফাঁকা জায়গায়। কনক আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পিঠের ওপর উঠে দাঁড়ালো। গণরুম থেকে সবাইকে ডেকে বের করে বললো, "একে চিনিস? এখন থেকে সাবধান হয়ে যা। এর সাথে যেন আর কাউকে না দেখি।"

কিছুক্ষণ পর রাখলো আমার গলার ওপর পা। দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

সে আমাকে অপমান করছিল জুনিয়রদের সামনে। বুয়েটে তখনো সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক মানা হতো। ও নিজেকে সুপিরিয়র প্রমাণ করতে চাইছিল।

এরপর ওরা ভয় পেলো, প্রভোস্ট চলে আসতে পারেন। তাই টেনে-হিঁচড়ে আমাকে নিয়ে গেল জিমনেসিয়াম আর তিতুমীর হলের মাঝখানে। আমি যেতে চাইনি। মনে হচ্ছিল, বাইরে নিলে আমাকে হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

গার্ড মামারা আমাকে চিনতেন। তাঁরা তাকিয়ে দেখলেন।

জায়গাটা কুখ্যাত। আশপাশের সব হল থেকে ছাত্রলীগের নেতারা জড়ো হতে লাগলো। এলো ০৯ ব্যাচের সিয়াম।

এতক্ষণ বেশি মারছিল কনক। এবার সবাই মিলে।

সিয়ামের মার আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই। আমি দাঁড়িয়ে আছি, আর সে স্ট্যাম্প শূন্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এসে আমার পায়ে বাড়ি দিচ্ছে। মারের চেয়ে মানসিক নির্যাতনেই সে বেশি আনন্দ পেতো।

রাত এগারোটা থেকে সকাল সাতটা। আমি পড়ে যাই, ওরা প্রশ্ন করে, "বল, কারা কারা শিবির করে?" আবার মার। আবার প্রশ্ন।

আমাদের তখন ওদের কাছে বিড়ালের হাতে ইঁদুরের মতো অবস্থা। যে আসছে, একটা করে বাড়ি দিয়ে যাচ্ছে। যেন মজার খেলা।

আমি পড়ে গেলে ওরা বললো, "নাটক করছে।"

একজন বললো, "হেলমেট পরিয়ে মাথায় আগুন ধরিয়ে দে।"

ওরা হেলমেট পরালো। লাইটার তো সবার কাছেই ছিল। আগুন মুখের কাছে আসতেই আমি ঠেলে উঠলাম। সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। "দেখলি, বলেছিলাম না নাটক!"

তারপর আবার মার।

একসময় আমার নার্ভগুলো যেন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। আর কোনো ব্যথা টের পাচ্ছিলাম না। শার্ট ছিঁড়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় রক্ত। জিন্সের মোটা প্যান্টটাও ছিঁড়ে গেছে।

শেষে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো তিতুমীর হলের ১২ ব্যাচের দেবদ্যুতি সরকার আর ইমতিয়াজের হাতে। ওরা একটা ময়লা পানির গর্তে আমার মুখ ঠেসে ধরলো, যেন দম বন্ধ হয়ে যায়। নাক-মুখ দিয়ে কাদা-পানি ঢুকছে। মুখ তুলতে গেলেই স্ট্যাম্পের খোঁচা।

যে খোঁচা দিচ্ছিল, সে ইমতিয়াজ।

আমার নিজের হলের জুনিয়র। চাইলেই র‍্যাগ দিতে পারতাম, দিইনি। বরং অন্যদের র‍্যাগ থেকে ওকে বাঁচিয়েছি।

সেদিন শরীরের ব্যথার চেয়ে বুকের ব্যথাই বেশি লেগেছিল।

ওরা আমার রুম থেকে একটা গেঞ্জি আনিয়ে ছেঁড়া, রক্তে সেঁটে যাওয়া শার্টের ওপরেই পরিয়ে দিল, যাতে বোঝা না যায় আমার সাথে কী করা হয়েছে। বললো, মুখ খুললে গুলি করবে। বললো, "দৌড় দে।"

আমার মনে হচ্ছিল দুই পায়ের ওজন আশি কেজি। নাড়াতেই পারছিলাম না।

বন্ধুকে বললাম, রিকশা করে ফুফুর বাসায় পৌঁছে দিতে। ফুফু গরম পানি করে রক্তে শরীরের সাথে লেপ্টে যাওয়া শার্ট আর প্যান্ট আমার গা থেকে ছাড়ালেন।

আমি ভেবেছিলাম এখানেই শেষ। কিন্তু কনক ফোন করে জানালো, ক্যাম্পাস ছেড়ে এসে আমি নাকি বড় ভুল করেছি। "দেখে নেবো।"

এর মধ্যে খবর এলো, ছাত্রলীগ BSW-এর সাথে বসেছে। আমাকে বহিষ্কার করা হতে পারে।

নির্যাতিত হলাম আমি। আর বহিষ্কারের আয়োজন আমারই নামে।

তখনই BSW স্যারের কাছে গিয়েছিলাম। আর শুনেছিলাম সেই কুমিরের গল্প।

বাবার কানে ভালো শোনার ক্ষমতা ছিল না। আমার বড় ভাই ফোনে আমার কাছে সব শুনে কাগজে লিখে লিখে বাবাকে দিয়েছিলেন। সেই লেখা পড়ে বাবা ভেঙে পড়লেন।

বাবা কখনো চাননি সন্তান বিদেশে যাক। আমার ভাই বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন, বাবা দেননি। আমার জন্মের পর পরই দাদা মারা যান, আমার নামটাও দাদার দেওয়া। তাই আমাকে সবসময় কাছেই রাখতেন।

সেই বাবাই এবার আমাকে দেশ ছাড়ার অনুমতি দিলেন। কারণ তাঁর ভয় ছিল, দেশে থাকলে আমাকে আবার মারা হবে। আত্মীয়রাও বললো, "আমরা টাকা দিচ্ছি, ওকে বিদেশে পাঠিয়ে দিন।"

আমি নিজে বুয়েট থেকে পাস করে বের হতে পারবো, সেই আশাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম।

ক্যাম্পাসে ঢুকতাম পেছন দিয়ে, শহীদ মিনারের দিক থেকে। পরীক্ষার হলে যেতাম সবার পরে, বের হতাম সবার আগে। সেমিস্টারের পরীক্ষা দিয়েছি লুকিয়ে। ক্লাস টেস্ট দিয়েছি স্যারদের অনুরোধ করে আলাদাভাবে। সিজিপিএ আবার পড়ে গেল।

পরবর্তী দুই মাসের বেশি সময় আমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারিনি।

তবু থামিনি।

বুয়েটে অনার্স শেষ করে থিসিস করলাম বিভাগীয় প্রধানের অধীনে। পেলাম সেরা থিসিসের "আব্দুল হামিদ অ্যাওয়ার্ড"। থিসিস জমা দেওয়ার দিনই বুয়েটেই একটা প্রকল্পে চাকরির অফার পেলাম। একই সাথে মাস্টার্সে ভর্তি। একদিনও বেকার থাকিনি।

কিন্তু ২০১৭ সালের ১৯ মে, শুক্রবার, সম্ভবত।

ময়মনসিংহ থেকে ফিরে বুয়েটের লাইব্রেরি-ক্যাফেটেরিয়ায় অ্যালামনাই সংবর্ধনায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই ছাত্রলীগ আমাকে আবার ধরলো। ঘটনা গড়ালো পুলিশ পর্যন্ত।

এরপর আমি আর বুয়েটের চাকরিতে ফিরিনি। জেলে বসেই বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।

যে ছেলেটাকে একরাতের আশ্রয় দিয়েছিলাম, তার সাথে আর কখনো আলাদা করে দেখা হয়নি। তার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই।

রাগ তাদের ওপর, যারা সেদিন আমার আশ্রয় হতে পারতেন। হল প্রশাসন, BSW, প্রভোস্ট, বন্ধুরা।

আমি চাই, সেদিন যারা আমাকে মেরেছিল, তাদের বিচার হোক। যারা দেখেও চুপ ছিলেন, তারাও জবাব দিন।

যাতে আর কোনো ছেলেকে কাউকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে নরক দেখতে না হয়।

সোলায়মান

ইউআরপি'১১
বুয়েট।

ফুটনোট: ভিকটিমের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ভিক্টিমের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।

সম্ভাব্যশাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।

নির্যাতনকারী
মো আবু সাঈদ কনক
বর্তমান সম্পৃক্ততা: ভিপি, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
তৎকালীন বুয়েট ছাত্রলীগ সেক্রেটারি
রাফাত ইমতিয়াজ চৌধুরী
বর্তমান সম্পৃক্ততা: Espec-Electrical Specialists, Darwin, Australia
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট তড়িৎকৌশল ‘১৪ ব্যাচ
কর্মী, বুয়েট শাখা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
সিয়াম হোসাইন
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট মেকানিক্যাল ‘০৯ ব্যাচ
সভাপতি, রশীদ হল বুয়েট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
মেহেদী হাসান রাসেল
বর্তমান সম্পৃক্ততা: আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত। বর্তমানে কাশিমপুর-৪ কারাগারে ফাঁসির সেলে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট পুরকৌশল ‘১৩ ব্যাচ
সাধারণ সম্পাদক, বুয়েট শাখা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

আরো দেখুন