বুয়েটে গিয়েছিলাম স্বপ্ন নিয়ে, ফিরেছি দুঃস্বপ্ন নিয়ে
আমার পরিচয় আর রুম নাম্বার শোনার সাথে সাথে সিনিয়র ভাইদের চোখের দৃষ্টি পরিবর্তন হয়ে গেল।
আবারও জিজ্ঞেস করলো, ৩২৪ নাম্বার রুম? মারুফ ভাইয়ের সিটেই আছিস?
আমি মাথা নাড়াই।
দ্বীপ, জয় এর সিগারেট খাওয়া থেমে গেল। সিভিলের কাজল ডেস্কটপের কাজ বন্ধ করে নড়েচড়ে বসলো।
এরপর বললো, ও থাকুক। তোরা সবাই বের হয়ে যা।
৩০১ পলিটিকাল রুম, জানতাম। এই রুমে ডোনেশনের টাকা তুলতে ঢুকলে র্যাগ খেতে হবে তাও জানতাম। যদিও হলে উঠেছি মাত্র ৭ দিন, বাট র্যাগ খাওয়ার প্রসেস ততদিনে আয়ত্ত করেই ফেলেছিলাম।
তাই কিছু না ভেবেই ঢুকে পড়ি। কিছুক্ষণ র্যাগ চলে।
এরপর আমাকে রেখে বাকিদের বের করে দেওয়া হয়। আমার মনে কু ডেকে উঠে। মাত্র ৭ দিন হলো ভর্তি হয়েছি। সবাইকে চিনিও না। তাহলে আমার সাথে এমন করার কারণ কী?
কারণ জানলাম একটু পরে।
আমি মারুফ ভাইয়ের বেডে উঠেছি। সেই মারুফ ভাই নাকি শিবিরের সাথী ছিলেন। যেহেতু মারুফ ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগ আছে, সেহেতু আমিও শিবির।
ততক্ষণে আমার শিরদাড়া বেয়ে শীতল স্রোত নামতে শুরু করেছে।
তবে তার আগেই দ্বীপ ভাই এসে প্রচন্ড জোরে আমাকে চড় মারলেন। বেশ কিছুক্ষণ আমি শো শো ছাড়া আর কোন শব্দ শুনতে পাইনি।
এরপর শুরু হয় আমার মোবাইল সার্চ করা। পুরো ফোন তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওরা কিছুই পায়নি। পাওয়ার কথাও ছিলো না অবশ্য।
এমনকি মারুফ ভাইয়ের সাথেও আমার মেসেজ ছিল একটাই। উনার রুমমেটের নাম্বার । যেন, আমি রুমে উঠতে পারি।
এইটুক মেসেজের উপর ভিত্তি করেই উনারা আমাকে শিবির ট্যাগ দিয়ে জেরা করা শুরু করে। হুমকি দেয়, শিবির স্বীকার করে নেওয়ার জন্য। স্বীকার না করলে ভয়ঙ্কর কোন ঘটনা ঘটবে।
আমার দিশেহারা লাগে, অসহায় লাগে।
সিভিলের ০৯ এর সিয়াম ভাই আর সিভিল ০৭ এর তন্ময় ভাই আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি কী বলবো? জানলে তো বলবো?
মেকানিক্যাল ০৯ এর শুভ্র ভাই অবশ্য এতোকিছুর অপেক্ষা করেন নাই। তিনি পিভিসি পাইপ দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। মনে হচ্ছিলো আজকেই আমার শেষ দিন। চড় থাপ্পড় লাথি তো ছিলোই। দ্বীপ আর শুভ্র পিভিসি দিয়ে আমাকে পেটাতে থাকে।
বুয়েটের নাম প্রথম শুনি কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে থাকার সময়।
নওগাতে বড় হয়েছি, ইউনিভার্সিটি বলতে বুঝতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেই।
এসএসসি আর ইন্টারে লেখাপড়ার বাইরে শুধু ক্রিকেটটাই খেলতাম। ফলে বেশিরভাগ সময়ই আমার কাটতো বইয়ে ডুবে থেকে। ফলাফলটাও হাতের কাছে পাই।
এসএসসিতে স্কলারশিপ পাই। এইচএসসির পর এডমিশন কোচিং করেছি রাজশাহী।
বুয়েটে চান্স পাওয়ার আমাদের বাসায় ঈদের উৎসব শুরু হয়েছিলো। বাবা মার আনন্দটা ছিলো দেখার মতো। কারণ এখন পর্যন্ত আমাদের পরিবার থেকে সর্বোচ্চ রাজশাহী ইউনিভার্সিটি পর্যন্তই এসেছে। বুয়েটে আমিই প্রথম।
সত্যি বলতে, বুয়েট নিয়ে আমার নিজেরও খুব ফ্যাসিনেশন ছিলো। দেশের সেরা ইউনিভার্সিটি। নিশ্চয়ই সেখানে দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা লেখাপড়া করে? তাদের কথা, আচার ব্যবহার, চিন্তাও নিশ্চয়ই অমনই সেরা?
আমার এই ফ্যাসিনেশন ধ্বংস হতে সময় লেগেছিলো মাত্র ৭ দিন।
আমি ভর্তি হয়েছিলাম নেভাল আর্কিটেকচার এন্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। আমার হল ছিলো আহসান উল্লাহ হল। তবে এলাকার পরিচিত এক ভাইয়ের সাহায্যে আমি নজরুল ইসলাম হলে থাকতে শুরু করি। ৩২৪ নাম্বার রুমে মারুফ ভাইয়ের বেডে আমি থাকতে শুরু করি।
২১ শে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত।
ঘটনার শুরুটা সন্ধ্যায়।
বয়স্ক এক লোক এসেছে চিকিৎসার সাহায্য চাওয়ার জন্য। নিয়ম হলো, এমন কেউ হলে আসলে ফার্স্ট ইয়ারের ৪-৫ জন ছেলেকে দিয়ে একটা টিম তৈরি করা হয়। তারা রুমে রুমে গিয়ে টাকা তোলে।
সেদিনের টিমে আমাকেও রাখা হলো। এবং টাকা তুলতে তুলতে এক পর্যায়ে আমরা ৩০১ এ পৌছাই পলিটিকাল রুম, র্যাগ খেতে হবে, জানতাম।
কিন্তু এই রুমে ঢুকে আমাকে তিন ঘন্টা মার খেয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যেতে হবে, এ আমার কল্পনাতেও ছিলো না।
যাইহোক, পিভিসি পাইপ দিয়ে পেটানোর পর তারা আমার রুমের আরো ৩ জনকে ঐ রুমে ডেকে আনে। তিনজন হলেন কামরুল ভাই, বেনজির ভাই আর ইকবাল ভাই।
কাউকেই আমি চিনতাম না।
ঐ তিনজনের বিরুদ্ধেও সেইম অভিযোগ। উনারা শিবির করেন।
এবার আমাদের তিনজনের উপরেই সমান তালে নির্যাতন চলতে থাকে। এমন সময় জয় ভাই বেনজির ভাইয়ের মাথায় হুট করে মাউন্টেন ডিউ এর বোতল দিয়ে সজোরে বাড়ি মারে।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, বেনজির ভাই আর বাঁচবেন না। এতো জোরে মারার পরেও কোন মানুষ বেঁচে থাকে? আমার নিজের পুরো শরীরে তখন মারের দাগ, দ্বীপ আর শুভ্র, এই দুই অমানুষের নির্যাতনে আমার শরীর তখন অবশ হয়ে গেছে। যেন আমার সকল অনুভূতি মরে গেছে, আমিও কি মারা যেতে চলেছি?
জানি না।
আমার খালি মনে পড়ছিলো আমার মায়ের কথা, বাবার কথা। ছেলে বুয়েটে পড়ে বলে উনাদের কত গর্ব, কত অহংকার, কত স্বপ্ন!!
আমাকে মারতে থাকে। আমার শরীরে আর ব্যথা লাগে না। ব্যথারাও কি তবে ক্লান্ত হয়? আমার এভাবে মার খাওয়া দেখে ওরা বলাবলি করতে থাকে যে আমি আসলে অনেক বড় ট্রেনিংপ্রাপ্ত। আমার নাকি মার খেয়ে অভ্যাস আছে।
আমার এসব কথাও আর শুনতে ইচ্ছা হয় না। মনে হয়, আমি আর এই জগতেই নাই। অন্য কোথাও চলে গেছি। স্বপ্নের বুয়েট দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার এই ধাক্কা সহ্য করা আমার জন্য ছিলো বেশ কঠিন।
তিন ঘন্টার এই নির্যাতনের মহাকাল শেষ হলো রাত বারোটায়।
৩০১ নাম্বার রুম থেকে আমাদের তুলে দেওয়া হলো ডিবির হাতে।
আমাদের নামে ভাঙচুর আর বিস্ফোরকের মামলা দেওয়া হয়। ২০১২ সালে ঢাকায় আমরা নাকি বোমা মেরেছি, ভাঙচুর করেছি। অথচ ঐ সময় আমি ছিলাম রাজশাহীতে, ঢাকাতে আমার টিকিটাও ছিলো না।
প্রায় দুই দিন আমাদের ডিবি কার্যালয়ে গুম করে রাখা হয়। ২৪ তারিখে আমাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কোর্ট আমাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
৪৩ দিন আমাকে জেলে থাকতে হয়। তবে ৪৩ দিন পর বুয়েটে এসে আমার নিজেকে মনে হচ্ছিলো এলিয়েন। আমি আর কোথাও নিজেকে স্যুট করতে পারি নাই, না ক্লাসে, না বন্ধুত্বে, না ঢাকার সমাজে।
ততদিনে সবার নিজ নিজ সার্কেল হয়ে গেছে, আমার কেউ নাই, আমি একদম একা। ইন্ট্রোডাকটরি ক্লাস মিসের কাফফারা হিসেবে টার্ম শেষে আসলো ২.৬৭ সিজিপিএ আর দুইটা ল্যাগ।
সারাজীবন এতো ভালো লেখাপড়া করে এসে আমার সঙ্গী হয় খারাপ রেজাল্ট আর ল্যাগ।
বাসায় এই খবরটা ছিলো বজ্রপাতের মতো। তবে এই বজ্রপাতের ধাক্কা সামলিয়ে আব্বু আমাকে হেল্প করার অনেক চেষ্টা করে। এলাকার লোকজন কেসের কথা শুনে বিশ্বাস করে নাই, তবে আফসোস করেছে অনেক।
এই ঘটনার পর আমি আর কখনোই হলে উঠার সাহস করিনি।
পরীক্ষায় ভালো লিখেও নাম্বার পেতাম না। হতে পারে টিচাররা দিতো না বা উত্তর করার সিস্টেমটাই আমি বুঝতাম না।
বুয়েটের এই নোংরা ছাত্ররাজনীতির পেছনের কুশীলব ছিলো এদের প্রশ্রয় দেওয়া ভিসিরা। এই ঘটনার পর বুয়েটে পা রাখতেও আমার ভয় লাগতো। বারবার ফিরে আসতো সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি।
ইউনিভার্সিটি জীবনে কত মানুষের কত স্মৃতি থাকে। হলের স্মৃতি থাকে। আমার কিছুই নাই।বুয়েট আমার কাছে ৭ দিনের একটা সফর হয়েই থেকেছে, যেই সফরের শুরুতে ছিলো স্বপ্ন, শেষে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন।
অনেক চেষ্টা করেও যে দুঃস্বপ্ন আমি ভুলতে পারি নি, পারি না।
এখন চাইলেও তো আর হারানো হল লাইফ ফেরত পাবো না। চাইলেও আবার নতুন করে ভালো ছাত্র হতে পারবো না। তবে আমি এই মানুষগুলোর কঠোর বিচার চাই।
যাতে ভবিষ্যতে স্বপ্নের বুয়েট কারো জন্য ৪ বছরের দীর্ঘ না হয়ে ৭ দিনের সফর না হয়ে যেতে পারে!!
ফয়সাল
বুয়েট।
ফুটনোট: ভিকটিমের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ভিক্টিমের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।
সম্ভাব্যশাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।