সাদা মাইক্রো দেখলেই এখনও চমকে উঠি : বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অন্ধকার অধ্যায়

১৫ মার্চ, ২০২৬

সাদা মাইক্রোতে তোলার পরেই আমার চোখ শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়। 

তারপর আমি আর কিছু দেখতে পাইনি। 

নিকষ কালো অন্ধকার নেমে আসে চারদিকে। 

একেই কি তাহলে গুম বলে? 

আমার মনে পড়ে আম্মার কথা। দুপুরে শেষবার কথা বলেছি। বলেছিলাম যে পুলিশ আমাদের নিয়ে যাবে। বাট সেই নিয়ে যাওয়া এমন হবে, ভাবিনি।

অন্ধকারে মানুষ দেখতে পায় না, এটা ভুল একটা কথা। বরং অন্ধকারেই মানুষ সবচে ভালো দেখে। অন্ধকারেই আমরা দেখতে পাই আমাদের ভয়, আমাদের অতীত , আমাদের আতঙ্ক। 

গাড়ি চলতে শুরু করে। হাত পেছনে, হাতকড়ায় বন্দি। তবে কি ইলিয়াস আলীকেও এভাবেই তুলে নেওয়া হয়েছিল? আমার বুকটা খা খা করতে থাকে। নিজের জন্য না, আম্মার জন্য, বাবার জন্য।

প্রথম বছরে ছিলাম শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা ছিলো খুব, তাই পরের বছর পরীক্ষা দিয়ে চলে আসি বুটেক্সে। ভর্তি হই ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে। 

যদিও বুটেক্সে আমার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা ছিলো ভয়ঙ্কর।

হলে উঠতে এসে দেখি ছাত্রলীগের দুই গ্রুপেয সংঘর্ষে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে আমাদের আর হলে উঠা হলো না। ৬ মাস পর ওসমানী হলের গণরুমে উঠি। অবশ্য ২০×২০ রুমে ৪০ জন থাকার অভিজ্ঞতা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। 

থার্ড ইয়ারের শেষে গিয়ে একটু আরাম করে থাকার মতো রুম পাই। 

কাজেই,বলা যায়, ২০১৮ তেই প্রথম আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারি বুটেক্স লাইফে। 

কিন্তু এই ২০১৮ র স্বস্তি বেশিদিন আমার ভাগ্যে জুটেনি। বরং এই ২০১৮ এখনও হয়ে আছে আমার জীবনের জন্য সবচেয়ে কঠিনতম বছর। 

২০১৭ র কোটা আন্দোলনের পর ২০১৮ র নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নড়ে যায় সারাদেশ। ধানমন্ডিতে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মিছিলে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এই হামলার পর কোনদিন রাজনীতি না বোঝা ছেলে মেয়েরাও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে লিখতে শুরু করে ফেসবুকে।

এই ফেসবুক পোস্ট কেন্দ্র করেই প্রথমে আমার বন্ধুকে টার্গেট করে বুটেক্স ছাত্রলীগ। তাকে সারারাত নির্যাতন করা হয়। মূলত ওর মোবাইল চেক করেই মেসেজে আমার নামটা ওরা পায়। তবে রাতে না, আমাকে গেস্টরুমে ডাকা হয় সকাল নটার দিকে। 

গেস্টরুমে ঢোকার সাথে সাথেই আমাকে ঐ মেসেজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তবে উত্তরের অপেক্ষা করা হয়নি। ৪০ ব্যাচের সাজ্জাদ স্ট্যাম্প দিয়ে আমার পায়ে এতো জোরে বাড়ি মারে যে আমি ফ্লোরে পড়ে যাই। এরপর নন্দী আর ফাহাদ এসে মারতে শুরু করে। 

এই নির্যাতনের মূল লিড দেয় ফাহাদ আর নন্দী। প্রশ্ন আসতে থাকে একের পর এক, কাকে চিনি, কে কে এখানে দায়িত্ব পালন করছে। প্রশ্নের সাথে সাথে চলে মারও। এক পর্যায়ে একজন এসে পায়ে আরেকটা বাড়ি দেয় স্ট্যাম্প দিয়ে। একটুও ব্যথা লাগে না। বুঝলাম, পায়ের সহ্য ক্ষমতা শেষ। ওদের নির্যাতন কখন শেষ হবে? 

তবে ওরা যে শুধু মারামারিতেই সীমাবদ্ধ ছিলো, তাও না। 

বরং কিছুক্ষণ পর পর অদ্ভুত এবং উদ্ভট প্রস্তাব দেয় যে এগুলোতে রাজি হলেই আমাকে আর মারা হবে না। বলাই বাহুল্য, ওদের এসব প্রস্তাবে আমি রাজি হইনি। 

এবার কিছুক্ষণের জন্য নির্যাতন থামে, আমাদের এবার ওসমানী হলের গেস্ট রুম থেকে নেওয়া হয় নজরুল হলের টিভি রুমে। ওখানে ঢুকেই দেখি আমাদের ৩-৪ জন বন্ধু। সবার অবস্থাই আমাদের মতো বিধ্বস্ত। বুঝতে আর বাকি থাকে না, ওদের সাথে কী হয়েছে। 

এর মধ্যে দফায় দফায় পুলিশ ক্যাম্পাসে এসে এসে একজন দুজন করে ধরে নিয়ে যেতে থাকে। তবে আমাদের পুলিশের হাতে না দিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এই গালিগালাজ মারের চেয়ে কম কষ্টকর ছিলো না। রাগে, দুঃখে, কষ্টে আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করে। 

আমাদের সারাদিন ঐ ঘরে আটকে রাখা হয়। প্রশ্ন ছিলো একটাই। আর কে কে আমাদের দল করে? আমি যতই চিনি না বলি, ততই গালিগালাজ আর মানসিক টর্চারের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ওরা আমার ফোনের মেসেজ থেকে সাকিব ভাইয়ের ন বের করে ফেলে। 

আমরাও সাকিব ভাইয়ের কথাই সবাই মিলে বলতে থাকি। যাতে একজনের উপর দিয়েই পার হয়ে যায়। তবে আমার উত্তর ছাত্রলীগ বিশ্বাস করেনি। আমার ফোন নিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় এনএসআই এর কাছে। 

এর মধ্যেই ওরা শিবির ছাড়িয়ে আমাদের কাছে হাজির করে জঙ্গিবাদের বয়ান। তুরস্কে পিএইচডি করা এক স্যারের সাহায্যে ফিলিস্তিনে পাঠানোর জন্য কিছু টাকা তুলেছিলাম। এটাকে ওরা জঙ্গি অর্থায়ন বলে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পড়ে লাগে। 

একটা উদ্দেশ্য ছিলো আমাদের ভয় দেখানো। 

আরেকটা উদ্দেশ্য ছিলো, পিএইচডিরত স্যার, মানে এমদাদ স্যার ছিলেন ছাত্রলীগের জম। তিনি প্রভোস্ট থাকার সময় নজরুল হলে ছাত্রলীগ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কাজেই, এখন উনাকে জঙ্গি ট্যাগ দিতে পারলেই উনার উপর ছাত্রলীগের একটা মধুর প্রতিশোধ নেওয়া হতো। 

কাজেই, সন্ধ্যা পর্যন্ত এমদাদ স্যারের সাথে জড়িয়ে আমাকে জঙ্গি বলে চালানোর একটা চেষ্টা করা হয়। 

সন্ধ্যার পর এনএসআই এর তিনজন সদস্য রুমে প্রবেশ করে। সকালে যিনি ফোন নিয়ে গিয়েছিলো, তিনি না। নতুন তিনজন। 

তাদের সাথে সাথে ঘরে প্রবেশ করে হল সভাপতি সাকিব আর হল সেক্রেটারি লিঙ্কন। দুইজনই ছিলো ৩৮ ব্যাচের। 

আনুমানিক রাত সাড়ে আটটার দিকে এনএসআই এর তিনজন সদস্য বলে, আপনাদের থেকে যেহেতু কোন সন্তোষজনক উত্তর পাইনি, এবার আপনাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। 

এরপরই সামনে দেখি সেই সাদা মাইক্রো। 

মাইক্রোতে উঠার আগ মুহূর্তে এক ভাইয়ের সাহায্যে বাড়িতে কথা বলি। 

মাইক্রোতে উঠার পরেই আমার চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। হাতে লাগানো হয় হাতকড়া। এরপর শুরু হয় আমাদের অন্ধকার যাত্রা। 

নিজের জন্য মায়া বা কষ্ট কিছুই হয় নাই। আম্মা হার্টের রোগী। আমার হারিয়ে যাওয়া সহ্য করতে পারবে তো? আমার সামনে ভেসে উঠে আমার বাবার মুখ, ভেসে উঠে আমার গ্রাম, স্কুল, কলেজ। গাড়ি চলতে থাকে অজানার উদ্দেশ্যে। এটাকেই কি তবে গুম বলে? 

৩০-৪০ মিনিট পর মাইক্রো থামে। তবে কি ক্রসফায়ার দেবে? দিতেও পারে। মানুষের অধিকার আছে, শিবিরের তো আর অধিকার নাই। তখনও আমাদের হাত আর মুখ বাঁধা। চোখে কিছু দেখছি না। 

আমাদের নেওয়া হলো একটা রুমে। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হলো বসে পড়তে। আমরা তখন পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে পড়ি। কোথায় আছি, কয়দিন আছি, বুঝতেও পারি নাই। বের হয়ে এসে ক্যালেন্ডার দেখে আবিষ্কার করি, দুইদিন পার হয়ে গেছে। 

স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে থাকে, তাহলে আমাদের ধানমন্ডি থানায় নেওয়া হয় আট তারিখ রাত দুইটার সময়। মামলায় লেখা হলো, আমরা ছাত্রদের উসকে দিচ্ছি আর গাড়ি ভাঙচুর করছি। আরেকটা মামলা দিলো কুখ্যাত ৫৭ ধারায়। ফেইক ফেসবুক পোস্ট, ফেইক কমেন্টের স্ক্রিনশট দিয়ে এই মামলাটা দেওয়া হয়। অথচ এসবের সাথে আমার নূন্যতম সম্পর্কও ছিলো না। 

এই দুই দিন আমার পরিবার এমন কোনো বাহিনী ছিল না, যার সাথে যোগাযোগ করেনি। কিন্তু কোথাও থেকে আমার সম্পর্কে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সবাই আমাকে আটক করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখন তাঁর কী অনুভূতি হয়েছিল। আমার আম্মু বলেছিলেন,
“আমি তোকে আল্লাহর কাছেই সোপর্দ করে দিয়েছিলাম। কারণ আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।”

কী ভয়ংকর ছিল সেই দিনগুলো—যা আমার এবং আমার পরিবারের ওপর দিয়ে গেছে। আমার আব্বুর অফিস পর্যন্ত তারা খোঁজ নিয়েছিল। আসলে এই পরিস্থিতি লিখে কখনোই বোঝানো যায় না, আমার এবং আমার পরিবারের ওপর দিয়ে ঠিক কী ভয়াবহ সময় অতিক্রম করেছে।

আমাকে জেলে থাকতে হয় প্রায় ৬৫ দিন। 

বলাই বাহুল্য এরপর আর আমার হলে থাকা হয়নি। বন্ধুরা ক্যাম্পাসে আমাকে এড়িয়ে গেলেও বাইরে ওরা আমার সাথে আগের মতোই মিশতো। শিক্ষকরা নিউট্রালই ছিলো, অতিরিক্ত কোন সমস্যা আমার সাথে করেনি। 

তবে অনেকগুলো কুইজ আর ল্যাব না দিতে পারার কারণে আমার রেজাল্ট আরও খারাপ হয়ে যায়।

খারাপ রেজাল্টের ভারের চেয়েও ভারী লাগে খারাপ স্মৃতির ভার। এখনও রাস্তায় সাদা মাইক্রো দেখলে আমি চমকে উঠি। এখনও চোখ বন্ধ করলে আমি সেই অন্ধকারটাই দেখি। 

অথচ আমার ইউনিভার্সিটি লাইফটা তো আলোয় আলোয় ভরে যাওয়ার কথা ছিলো।

সেই আলোকে যারা এতোটা অন্ধকারে ঢেকে দিলো, তাদের বিচার করার দায় রাষ্ট্রের, বুটেক্স কর্তৃপক্ষের। আশা করি, অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি দিয়ে বুটেক্স কতৃপক্ষ আমার উপর হওয়া এই জুলুমের দায় শোধ করবে।

গালিব

বুটেক্স।

ফুটনোট: ভিকটিমের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ভিক্টিমের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।

সম্ভাব্য শাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।


আরো দেখুন