বুয়েটে প্রিতমের উপর নির্যাতন: একটি নৃশংস ঘটনা

২৫ এপ্রিল, ২০২৫

জুলাই ২০২৪ এর কোটা সংস্কার আন্দোলনকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যাবহার করে নির্মমভাবে দমন করতে গিয়ে জনরোষ আর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। কিন্তু এই কোটা সংস্কার আন্দোলন ২০১৮ সালেও একবার হয়েছিলো। আর সেই সময় আমি পার করি আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দীর্ঘ রাত।

 

বাংলাদেশের দক্ষিনের একটা জেলা থেকে আমি পড়তে এসেছিলাম বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে। ভাললাগা ছিল, ভালবাসা ছিল বুয়েটের প্রতি। পড়াশোনা, টিউশনি, খেলাধুলা, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা- এমনভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল জীবনটা, মন্দ ছিল না। মিশুক আর আড্ডাপ্রিয় মানুষ হিসেবে হলের সবার সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল। হলের পলিটিকালদের সাথে ও আমার ছিল ভাল সম্পর্ক। ২০১৮ সাল এর এপ্রিল মাস। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অগ্নিগর্ভ ধারণ করেছে কোটা আন্দোলনকে ঘিরে। বুয়েটেও ছুয়ে যায় আন্দোলনের ঢেউ। ক্যাম্পাসের অনেকেই তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হচ্ছিল আন্দোলনে।

 

এরই মাঝে ২০১৮ সালের ৯ই এপ্রিল নূর, রাশেদসহ এই আন্দোলনের সংগঠক ছাত্রনেতারা আওয়ামিলীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে কথা বলে এক মাসের জন্য আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন মনে করেছিলো, এটা কেবল সময়ক্ষেপণ। তারা শাহবাগে অবস্থান চালিয়ে গেল, সংখ্যায় অল্প হলেও ঘোষণা দিল যে আন্দোলন থেমে যায় নি।

 

সেদিন আমি টিউশন শেষে টিএসসিতে যাই কোটা আন্দোলনে যোগ দিতে। সেখানে আমি সহ ২০-২৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম, যারা প্রেস ব্রিফিং দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল যে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। চারপাশে ছিল অনেক মিডিয়া, আর আন্দোলনকারীদের সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা, তাই আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম, টিভি ক্যামেরার ফ্রেমে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল।

 

রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমি হলের রুমে ফিরলাম। কিছুক্ষণ পর আমার এক ব্যাচ জুনিয়র শোয়েব আহমেদ জয় আমাকে জানালো, সভাপতি পদপ্রার্থী জামিউস সানির কাছ থেকে ফোন এসেছে—আমাকে ছাত্রলীগের রুমে যেতে হবে, সাথে আমার ফোন এবং ল্যাপটপ আনতে হবে। মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম কেন ডাকা হচ্ছে—সেদিন আন্দোলনে উপস্থিত ছিলাম এবং টিভির ফুটেজে দেখা গিয়েছে। এক অজানা আতঙ্কে মন ভরে গেল।

 

আমি জামির রুমে গেলাম, সে একা এক রুমে থাকত। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম ছাত্রলীগের ১৩-১৪ জন উপস্থিত। সেখানে জামি তার ফোনে আমাকে সেদিনের আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও দেখাতে লাগল। কেন সেখানে গিয়েছি, শিবির করি কিনা—এই প্রশ্নগুলো ছুড়তে লাগল।

 

হঠাৎ করেই, কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে, আরেকজন সিনিয়র আহসানউল্লাহ যে কিনা এখন বেসরকারী বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব) এ চাকুরি করে, আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পেটাতে শুরু করে। প্রথম আঘাতটা এলো অপ্রত্যাশিতভাবে—একটা শক্ত মুষ্টি আমার পেটে এসে লাগল। আমার শরীর ঝাঁকুনি খেলো, আর এক মুহূর্তে শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। আমি হঠাৎই কুঁকড়ে গেলাম, ব্যথায় চোখ ফেটে জল আসছিল, কিন্তু একফোঁটাও বের হলো না। এর পরের আঘাতটা এল পিঠে, এতো জোরে যে আমি প্রায় মাটিতে পড়ে গেলাম।

 

শারীরিক নির্যাতনের সাথে চলছিল তাদের ইন্টারোগেশন। আমাকে শিবির প্রমান করার আপ্রান চেষ্টা। আমার ফেসবুক পোস্ট, কমেন্ট, মোবাইলের কল, মেসেজ সব কিছু তারা চেক করছিল। আওয়ামীলীগ সরকারের সমালোচনা করা আমার কোন একটা পোস্ট পেয়ে বলছিল, এটাই প্রমান যে আমি শিবির করি। আমি বললাম সরকারের সমালোচনা করলেই কেন আমি শিবির হয়ে যাব। কিন্তু কোন প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থন করলেই তারা আরও বেশি নির্যাতন করছিলো। আমি বুঝতে পারলাম, এখানে কোনো যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। তারা শুধুই মারবে। আহসান একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছিল, কখনো ঘুষি, কখনো লাথি। সে আমাকে ঠেলে দেয়ালে ঠুকে দিল, তারপরে জামি এসে কিল মারতে শুরু করল। তারা আমাকে নির্যাতন করছিল আর সিগারেট খাচ্ছিল এবং এক সময় সেই সিগারেট দিয়ে ওরা আমার শরীরে ছেকা দেওয়া শুরু করলো।

 

আমার মনে হচ্ছিল যেন একটা খাঁচায় আটকে পড়েছি, কোনো আশ্রয় নেই, কোনো মুক্তি নেই। ওরা এতো ক্ষিপ্ত ছিল- মনে হচ্ছিলো যেন পুড়িয়ে, ভেঙ্গে চুরে আমার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করবে যে আমি শিবির করি আর আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম কবে এটা শেষ হবে।

 

জামি আর আহসানের নির্যাতনের ধাপ যখন শেষ হল তখন তারা আমাকে তাদের জুনিয়রদের, যারা ছিল আমার ব্যাচমেট এবং বন্ধু তাদের হাতে তুলে দেয়। এদের মধ্যে ছিল সিএসইর আবির বিন্দু, মেকানিকাল এর নিলয় দাস, দিব্য মন্ডল ও দীপ্ত আকাশ রায়। তারা আবারও আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করে। বেশি আক্রমনাত্মক ছিলো আবির বিন্দু, মেহেরপুরের গাংনিতে বাড়ি। এর মধ্যে নিলয় দাস আমাকে লাথি মারা শুরু করে। এবং পিঠে টানা ১০-১২ টা ঘুষি মারে। এভাবে আরও কয়েক ঘন্টা চলতে থাকল, দুই তিন ঘন্টা হবে হয়ত। এরা কিছুক্ষন পরপর বাইরে গিয়ে কারো সাথে যেন কথা বলছিল। আমি পরে জানতে পারি যে, বাইরে সেদিন দাড়ায়ছিল তৎকালীন বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার। সে নাকি পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কোনভাবে তারা আমার শিবির সংশ্লিষ্টতা প্রমান করতে পারলে পুলিশে সোপর্দ করবে।

 

অবশেষে আমার জীবনের সেই দীর্ঘ ভয়ঙ্কর রাতের সমাপ্তি হয়। আমাকে ছাড়ার আগে তারা হুমকি দিল যে আমি সবসময় নজরদারিতে থাকব।

পরের দিন সকালে আহসান আমাকে ডাকল, একটা নাপা ট্যাবলেট দিল, যেন সব ব্যথা মুছে যায়। সে বলল, "গত রাতের ঘটনা ভুলে যাও।" অথচ তার মুখে কোনো অনুশোচনা ছিল না। কয়েকদিন পর জামি স্বীকার করল যে আমাকে মারাটা তার ভুল ছিল, কিন্তু ক্ষমা চাইতে তার অহংকারে বাঁধা দিল।

 

এই নির্যাতন আমাকে এক অসীম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। আমি আর সেই আগের মানুষটা ছিলাম না, বুয়েট ক্যাম্পাসটাও আমার সেই চির চেনা আনন্দের ক্যাম্পাস ছিল না। প্রতিটা আঘাত আমাকে একটু একটু করে ভেঙে দিয়েছিল, আর সেই দাগগুলো আজও আমার মধ্যে রয়ে গেছে।

 

আবরার ফাহাদের হত্যার পর আমার উপরে নির্যাতনকারীদের অনেকেই ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়। আবার কেউ কেউ বহাল তবিয়তে সরকারি চাকরিও করছে। সময়ের পরিক্রমায় আমি নিজেও সরকাররের একটা গুরুত্বপূর্ণ চাকরিতে আছি। কিন্তু নির্যাতনকারীদের কেউই আজ পর্যন্ত আমার কাছে ক্ষমা পর্যন্ত চায়নি। যারা একবার অমানুষ হয়ে যায়, তাদের হৃদয়ে আল্লাহ মোহর মেরে দেন, এদের মনুষ্যত্ব হয়তো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

 

প্রিতম (ছদ্মনাম)

কেমিকাল-১৩ ব্যাচ, বুয়েট

ফুটনোট: প্রিতমের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা প্রিতমের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।

সম্ভাব্য শাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।

নির্যাতনকারী
জামিউস সানি
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট (মেকা'১২)
সাবেক সভাপতি, আহসানুল্লাহ হল ছাত্রলীগ, বুয়েট
মোঃ আহসান উল্লাহ
বর্তমান সম্পৃক্ততা: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট (মেকা'১১)
সাবেক সহ-সভাপতি, বুয়েট ছাত্রলীগ
আবির বিন্দু
বর্তমান সম্পৃক্ততা: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট (সিএসই'১৩)
সাবেক সহ-সভাপতি, বুয়েট ছাত্রলীগ
নিলয় দাস
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট (ইইই'১৩)
সাবেক সহ-সভাপতি, বুয়েট ছাত্রলীগ
দিব্য মন্ডল
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট (কেমিক্যাল'১৩)
সাবেক সহ-সভাপতি, বুয়েট ছাত্রলীগ
দীপ্ত আকাশ রয়
বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েট (মেকা'১৩)
সাবেক সহ-সভাপতি, আহসানুল্লাহ হল ছাত্রলীগ, বুয়েট

আরো দেখুন