বেঁচে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু সেই রাত আমার শরীর, মন, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎকে চিরতরে বদলে দিয়েছে.....
বেঁচে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু সেই রাত আমার শরীর, মন, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎকে চিরতরে বদলে দিয়েছে…..
রাত এগারোটা থেকে ভোর চারটা- সময়ের হিসেবে পাঁচ ঘন্টা। এই পুরো পাঁচ ঘন্টা আমাকে নির্যাতন করা হয়েছিল। স্ট্যাপ, পাইপ, রড, কিল ঘুষি...কোনো কিছুই বাদ পড়েনি। এতক্ষণ একটানা পেটানো হলে যে কারো পক্ষে বেঁচে থাকা মুশকিল। খোদার দয়ায় আমি টিকে যাই ঠিকই, কিন্তু আমার কিডনী ফেইল করতে শুরু করে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আমাকে নামতে হয় কিডনী বাঁচানোর যুদ্ধে।
আমি লুৎফর রহমান। বাবা আজিজুর রহমান পেশায় ছিলেন ব্যাংকার, এখন অবসরে আছেন। দুই ভাই ও তিন বোনের সংসারে আমি তৃতীয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। প্রসাদপুর ফাজিল (বর্তমানে কামিল) ডিগ্রি মাদ্রাসা থেকে ২০১২ সালে আমি দাখিল পাশ করি। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই পত্র-পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল। প্রত্যেকটা ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে পত্রিকাজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া ছাত্রদের ছবি ছাপা হতো। কৃতি ছাত্রদের সাফল্যের হাসি দেখে আমিও স্বপ্ন দেখি, একদিন পত্রিকায় আমারও ছবি আসবে।
বাবা-মা চেয়েছিলেন আমি যেন আলেম হই। তাঁদেরকে বুঝিয়ে বলি, প্রয়োজনীয় দ্বীনি শিক্ষা আমি অর্জন করেছি। জেনারেল শিক্ষাটাও জরুরি। পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ দেখে তাঁরা আমাকে বাধা দিলেন না। দাখিল শেষ করে আলিম কোর্সের জন্য আমি ঢাকার তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম। যথাসময়ে আলিম শেষ করলাম। রেজাল্ট এসেছে প্রত্যাশিতভাবেই ভালো। এবার ভর্তি পরীক্ষা।
অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিলাম। ভালো সিরিয়াল আসায় কুয়েটকে বেছে নিলাম। সাবজেক্ট পেলাম, Urban and Regional Planning(URP). তখন সিট সংকটের কারণে হোস্টেলে এলটমেন্ট থাকলেও প্রথম বছর বাইরে থাকতে হতো। আমাকে মেসে উঠতে হলো।
ক্লাশ শুরু হয় ২০১৫ সালের পহেলা এপ্রিল। মেসে থাকলেও আমি হোস্টেলের ডাইনিং এ খাওয়া দাওয়া করতাম। টিউশনি ও বড় ভাইদের প্রোজেক্টে কাজ করে যে টাকা আসতো তাতে আমার মোটামুটি চলে যেতো। আর্থিকভাবে স্বাধীন হয়ে গেলাম। শুধু আক্ষেপ ছিল হোস্টেলের একটা সিটের। এক বছর পরে অপেক্ষা শেষ হলো। পেয়ে গেলাম বহুল কাঙ্ক্ষিত হোস্টেল সিট।
আমার ঠিকানা লালল শাহ হলের ২০৯ নাম্বার রুম। পরিচিত কয়েকজন বড় ভাই দৌলতপুরে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক কোচিং করাতেন। উচ্চশিক্ষার ধারণা নিতে আমিও সেখানে যাওয়া আসা করতাম। পড়াশোনা, টিউশনি, কোচিং...সবমিলিয়ে হোস্টেলের প্রথম বছরটা পার করলাম বেশ নির্বিঘ্নে ও আনন্দে।
তারপর আসল সেই দিন! ভয়াল, বীভৎস, বিভীষিকার দিন!
তারিখ পহেলা মে, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ। মে দিবসের ছুটির দিনে সন্ধ্যার পর টিউশনি শেষে হলে ফেরার পর পরিচিত একজন বলল, লুৎফর একটু সাবধানে থেকো!
কথাটা শুনে আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, দৌলতপুরে বড়ভাইদের কোচিং সেন্টারে পুলিশ রেইড দিয়ে কয়েকজনকে ধরে নিয়েছে। তাদের একজন আমার রুমমেট। রুমমেটের জন্য একটু খারাপ লাগলো কিন্তু খুব একটা ভয় পেলাম না। কোথাও কোনো অন্যায় করিনি, ভয় পাব কেন?
অচিরেই ভুল ভাঙ্গল। অতটা ভয় না পেলেও রুমমেটের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছিল খুব। আমি পায়চারি করছিলাম হোস্টেলের করিডোরে। সময় তখন রাত দশ-এগারোটার মাঝামাঝি। আমার সামনে এসে উদয় হলো এক ছাত্রলীগ নেতা। নাম রুদ্রনীল সিনহা, আইএম-১৩ ব্যাচ।
রুদ্রনীল ঠাণ্ডা স্বরে বলল, লুৎফর আসো! তোমার সাথে কথা আছে।
আইপিএ বিভাগের আরেক ছাত্রলীগ নেতা এসেছিল রুদ্রনীলের সঙ্গে, তার নাম ও পদ-পদবী দুইটাই এই মুহুর্তে মনে নেই। তবে এটা জানি তাকে পরবর্তীতে কুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি করা হয়। আমি ওদের পাশে ভীত পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম ছাত্রলীগের ডেরায়।
ততক্ষণে বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রলীগ জড়ো করেছে আমার মতো আরো বিশ জনের মতো শিকার। ছাত্রলীগ নেতাদের মাতাল-রক্তখেকো দৃষ্টির মধ্যে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেগুলো। অতি দ্রুত আমি জেনে গেলাম আমাদের ডেকে নেবার কারণ। পুলিশ কোচিং সেন্টারে কয়েকটা নামের লিস্ট পেয়েছিল। দৌলতপুর থানার ওসি এসএম আনোয়ার হোসেন সেগুলো তুলে দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে। লিস্টের নামগুলোর মধ্যে যাদেরকে চেনা যায় তাদের ধরে এনে অচেনাদের খুঁজে বের করাই আয়োজনের উদ্দেশ্য।
তালিকায় আমার নাম না থাকলেও ধরে আনার কারণ মূলত সন্দেহ। রুমমেট গ্রেফতার হয়েছে। তারা ধারণা করেছিল আমি কিছু জানি নয়তো কোনোকিছুতে হয়তো জড়িত আছি। অবশ্য কোনো কারণ ছাড়াও যে কাউকে ধরে আনা বা মারধর করা তাদের অভ্যাসে ছিল।
আমাকে ইন্টারোগেশন শুরু করে রুদ্রনীল সিনহা।
“বল তোর রুমমেট কী করে? কোচিং এর সাথে কী সম্পর্ক?”
আমি আমতা আমতা করে উত্তর দিই।
রুদ্রনীল একটা তালিকা নিয়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। হুংকার দিয়ে বলে, “এইগুলা কার নাম?”
সাংকেতিক ভাষায় লেখা নাম, আমি আসলেই চিনতে পারছিলাম না।
আমি কাতর হয়ে বলি, “চিনি না ভাই।”
আমার বলা শেষ হয় না, কানের ওপর থাপ্পড় পড়ে। রুদ্রনীল আবার প্রশ্ন করে। আমি আবার একই উত্তর দিই। আমার উত্তরের জবাবে সে থাপ্পড় মারে। এভাবে চলতে থাকে অনেকক্ষণ। কী এক অদ্ভুত প্রশ্ন উত্তর খেলা!
এসব যখন চলছে, হঠাৎ দেখি ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে কৌতূহলী উত্তেজনা বিরাজ করছে। কারণ এইমাত্র নতুন আরেকটা লিস্ট পাওয়া গেছে। সেই তালিকা স্পষ্ট করে লেখা আছে কয়েকটা নাম। তাদের মধ্যে একটা নাম, লুৎফর রহমান। হ্যাঁ, আমার নাম অবশেষে পাওয়া গেল।
আমাকে মুহুর্তের মধ্যে আলাদা করে ফেলা হলো। এতক্ষণ চড়-থাপ্পড়কে মনে হচ্ছিল অত্যাচার, অত্যাচারের আসল রূপ দেখলাম তারপর। নির্যাতন যে কত নির্মমভাবে করা যায়, আমি তার সাক্ষী হলাম।
ঐ সময়ে কুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি ছিল মেকানিক্যাল ০৮ ব্যাচের সাফায়েত হোসেন নয়ন এবং সাধারণ সম্পাদক সোহান। তাদের ইশারা, আদেশ ও মদদে চলছিল অত্যাচারযজ্ঞ। আমাকে মারার জন্য ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হাতে তুলে নিল ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প, লোহার পাইপ, পানির পাইপ, রড, বেল্ট। শুরু হলো পেটানো। পুরো শরীরের মধ্যে কেবল মাথাটাকেই ক্ষমা করল তারা। কৃষক যেমন মাঠে নিড়ানি দেয়, কসাই যেমন মাংসের কিমা করে...আমার শরীরকে ঠিক সেভাবে নিড়ানি দিয়ে যেন কিমা করা হলো। মাথায় আঘাত না করা ওদের মহত্ব নয়। মাথার আঘাতে আমি মারা যেতে পারি। তারা একটা খেলায় নেমেছে। মরে গেলে খেলা শেষ, তারা কোনোভাবে খেলা নষ্ট করবে না। সবচেয়ে বেশি আঘাত পড়ল পায়ের তলায়। একেকজন একেকদিকে আঘাত করে, সেদিকে মোচড় দিতেই অন্যদিকে ধেয়ে আসে স্ট্যাম্প কিংবা পাইপ। আমি চিৎকার করি, আকুতি করি। এতসবের মধ্যেও অবাক বিস্ময়ে ভাবি, আমার বয়সী কতগুলো ছেলে নির্যাতনের এত কায়দা জানে কীভাবে? তাদের কে শেখাল পায়ের আঘাতে ব্যথা পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি?
ওদের মারধর এতটা তীব্র, তাৎক্ষনিক ও ভয়াবহ ছিল যে আমি তাদের সবাইকে চেনারও সুযোগ পাইনি। যাদেরকে চিনতে পেরেছিলাম, তাদের প্রায় সবার নাম ভুলে গেছি। অবশ্য দুইজনের কৃতিত্ব এত বেশি ছিল যে আমার বিধ্বস্ত মস্তিষ্ক চেষ্টা করেও তাদের নাম ভুলতে পারেনি। সিভিল থার্টিন ব্যাচের আসাদুজ্জামান জয় এবং আইপিই ফোরটিন ব্যাচের তানভীর রেজওয়ান মুন। ক্রিমিনালদের দলে এদের ভূমিকা ছিল জল্লাদের মতো।
একটা প্রশ্ন, আমার “জানি না উত্তর” এবং এক দফা পেটানো...এমন ক্রমধারা যখন চলছে তার ফাঁকে ওদের একটা দল চলে গেছে আমার রুমে। পুরো রুমটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে অপরাধের আলামত সন্ধান করা হলো। আমার কাছে কিছুই পায়নি। তবে আমার রুমমেটের বিছানার নিচে কোচিং সেন্টারের হিসাব সংশ্লিষ্ট কিছু একটা পায় তারা।
আমার রুমে কিছু না পাওয়ার কারণে তাদের ক্রোধ কমার বদলে যেন আরো বাড়ে। একটু বিরতি দিয়ে শুরু হলো মার, দ্বিগুণ উদ্যমে। আমার পাশাপাশি ধরে আনা অন্যদের ওপর দিয়েও যাচ্ছে একই ঝড়। নিজের যন্ত্রণার পাশাপাশি কানে আসছে অনেকগুলো ছেলের আর্তনাদ। কেউ কেউ অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নতুন নাম বলছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে টর্চার সেলে ভিক্টিমের সংখ্যাও বাড়ে।
গায়ের ব্যথা ছাপিয়ে এক সময় বুকের ছাতি ফাটা তৃষ্ণা আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। চাইব না চাইব না করেও আমি জল্লাদের কাছেই পানি চাই। ওরা পানি দেবার বদলে আবার মারে। ছাত্রলীগের একেকজন নেতা রুমে আসে, আমার সাথে তাদের পরিচয় হয় পেটানোর মাধ্যমে। লালন শাহ হলের মধ্যে আমিই ছিলাম একমাত্র শিকার। অন্য হলের সবাইকে ভাগাভাগি করে যতটুকু মারধর করেছিল, আমাকে হলের পক্ষে একাই ততটুকু ভার নিতে হলো। কতক্ষণ পর জানি না, তবে একসময় আমার শরীর প্রায় ছেড়ে দিল। আমার আর চিৎকার করারও শক্তি অবশিষ্ট রইল না। গলা খটখট শুকনো। চিৎকার করলেও সে আওয়াজ গলাতেই রয়ে গেছে, মুখ পর্যন্ত আসে না। আমি বিনা প্রতিরোধে পড়ে থাকলাম। শুয়ে থাকা কুঁকড়ানো শরীরেও অত্যাচার করল আরো অনেকক্ষণ।
রাত চারটার দিকে আমার ওপর ঝড় থামে। ততক্ষণে লালন শাহ হল থেকে ধরে এনেছে আরেকজনকে। আর পেটালে আমি মরে যাব নাকি নতুন শিকারকে সময় দেবার জন্য, জানি না; আমি রক্ষা পেলাম। ততক্ষণে আমার পুরো শরীর ফুলে গেছে। চামড়ার যেদিকে তাকাই সেখানেই কালশিটে দাগ।
আমাকে পানি খেতে দেওয়া হলো। জন্মের তৃষ্ণা নিয়ে পানি খেলাম। কিন্তু হজম হলো না। বমি করে দিলাম তখনই। তারপর অনেকদিন আমি মুখে আর কিছু খেতে পারিনি। বারবার বমি হয়েছে, অজস্রবার।
হোস্টেলে মানবতাবিরোধী অপকর্ম হচ্ছে এমন তথ্য আমাদের প্রভোস্ট ও শিক্ষকদের রাতেই জানানো হয়েছিল। তারা রাতে কোনো ভূমিকা নেননি। সকালে এসে BSW ড. সোবহান স্যারের দল কঠিন ভূমিকা নিলেন। ভূমিকা হলো- আমরা যারা অত্যাচারের শিকার হয়েছি, পুলিশ ডেকে সবাইকে তুলে দিলেন আইনের হাতে! আমাদের অপরাধ কী, মারধর করা ঠিক হলো কিনা...এসব তারা আমলেই নিলেন না।
আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত, হাঁটতেই পারছি না, বারবার বমি করছি...এমন অবস্থায় পুলিশি গ্রেফতারের মাধ্যমে দ্বিতীয় ও সম্ভবত আগেরচেয়েও বড় অবিচারের শিকার হলাম। আমাদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো ফুলতলা হেলথ কমপ্লেক্সে। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে দেয়া হলো ব্যথার ইনজেকশন। ডাক্তাররা ধারণা করলেন একমাত্র আমার অবস্থা গুরুতর। আমাকে রেফার করলেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অন্যদের পুলিশ নিয়ে গেল খান জাহান আলী থানায়।
খুমেক হাসপাতালে আমি ছিলাম দশদিন। দশদিনের চিকিৎসায় উন্নতির বদলে আমার শরীরের ব্যাপক অবনতি হলো। কালশিটে কমেনি একটুও। বমির তীব্রতা আরো বেড়েছে। প্রস্রাব বন্ধ। সবচেয়ে বড় কথা, শরীর ফুলে যাচ্ছে আশংকাজনকভাবে। ডাক্তার এবার অর্গান ড্যামেজের আশংকা করলেন। আমি রোগী ঠিক, কিন্তু মূল পরিচয় তো কয়েদী। এক দু-দিনে যে রোগ নিশ্চিত হবার কথা ছিল, সেটা ধরা পড়ল দশদিন পর। ক্রিয়েটিনিন এর মাত্রা ১ মিলি/ডিএল থেকে বেড়ে চলে ৭ পার করে ফেলেছে। অর্থাৎ কিডলী ফেইল করার পথে। সামনে পথ দুইটা। ডায়ালাইসিস অথবা মৃত্যু!
পরেরদিন কোর্টে তোলার আগে আরেকবার ক্রিয়েটিনিন টেস্ট করা হয়। দেখা গেল ক্রিয়েটিনিন ১২ পর্যন্ত উঠে গেছে। তারমানে ডায়ালাইসিস না করলে মৃত্যু একেবারে সন্নিকটে। বিচারক কাগজপত্র দেখে আমাকে তাৎক্ষণিক ডায়ালাইসিস করানোর নির্দেশ দিলেন এবং কর্তব্যে অবহেলার জন্য ডাক্তারকে শোকজ করলেন।
গাজী হাসপাতালে ১০ দিনে চার সেশন ডায়ালাইসিসের পর ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে আসে। শরীর ফোলা কমে এবং সার্বিকভাবে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করি। পরের দশ দিন আমাকে কাটাতে হয় কারাগারে। এক মাসের পরাবাস্তব তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণ অবশেষে মুক্ত বাতাসে ফিরে আসি। ফিরে আসি পরিবারের কাছে।
ক্যাম্পাসে নির্যাতনের শিকার অধিকাংশ ছেলেরা নিজেদের বীভৎস অভিজ্ঞতা পরিবারকে জানায় না। আমিও আমার দুলাভাই ছাড়া আর কাউকেই কিছু বলিনি। তিনি ঘটনার পরেরদিন গোপনে খুলনা আসেন। কিন্তু যখন দেখা গেল নির্যাতন মারা না গেলেও কিডনী ফেইলিওরে আমার আমি মৃত্যু ঝুঁকিতে আছি...তখন আর বাবা-মাকে না জানিয়ে উপায় ছিল না। শরীরের আঘাতের কষ্ট বর্ণনা করা যায়। কিন্তু মা-বাবা আমার জন্য যে কষ্ট পেয়েছেন, দুশ্চিন্তা করেছেন; এই যন্ত্রণা প্রকাশ করা কঠিন।
শরীর কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার ফিরে আসি ক্যাম্পাসে। তবে হলে থাকার সাহস করলাম না। সেদিন নির্যাতন করা কাউকে কাউকে আবার নির্যাতন করা হলেও কোনো কারণে আমাকে আর কখনো ঘাটায়নি কেউ। শিক্ষক ও সহপাঠিরা আমাকে সহজভাবে নিয়েছিল। ছাত্রলীগের ছেলেরা আমার থেকে দূরত্ব রাখলে অন্য সবার বৈষম্যহীন আচরণ আমার আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। সবার সহযোগিতায় গ্রাজুয়েশন শেষ করে আমি ঘরে ফিরি।
ছাত্রলীগ আমাকে না ঘাটালেও পরের সময়গুলোতে ভয়-ভীতি আমার পিছু ছাড়েনি। অজানা আতংক চেপে থাকতো বুকে। ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম বা কমিটি ঘোষণার আগে-পরে কয়েকদিন আমি ক্যাম্পাসে যেতাম না। সবচেয়ে ক্ষতিটা হয় পড়াশোনায়। কিছুদিনের গ্যাপ এবং শারীরিক মানসিক আঘাতের কারণে চেষ্টা করেও আমি রেজাল্ট আগের জায়গায় নিয়ে যেতে পারিনি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনায় গ্রুপ ওয়ার্ক, গ্রুপ স্ট্যাডি খুব গুরুত্বপূর্ণ। হোস্টেলে না থাকলে গ্রুপ স্ট্যাডি হয় না। আমার সামগ্রিক রেজাল্টে এটার প্রভাব পড়েছিল। আমি থিসিসের জন্যেও এমন একটা সাবজেক্ট নিয়েছিলাম যেখানে ল্যাবে কম যাওয়া লাগে। একটা রাত আমার শরীর, মন, পড়াশোনা, রেজাল্ট এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার...সবকিছুকে এলোমেলো করে দিয়েছিল।
আমি এখন ভালো আছি। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে। এতদিন পর আমার শরীরে ক্ষত নেই। কিন্তু মনের ক্ষত আজও শুকোয়নি। আমি জানি, আমার কোথাও কোনো অপরাধ ছিল না। তাহলে আমার প্রতি মৃত্যু মুখে ঠেলে দেয়া নির্মম অবিচারের কারণ কী?
দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে আসা ছেলেগুলোর মনে এত ক্ষোভ, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা কীভাবে আসে; তাতে দায় কার এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এমন কিছু না ঘটে তার জন্য সব অপরাধীর উপযুক্ত বিচার হোক।
লুৎফর রহমান
কুয়েট
ফুটনোট: লুৎফর রহমানের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা লুৎফর রহমানের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।
সম্ভাব্য শাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।